মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

বিভাগের ঐতিহ্য

রংপুরের ঐতিহ্য

রংপুর বিভাগ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ। সুপ্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চল গৌরবময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ইতিহাসের অধিকারী। এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে  যমুনা,তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, ধরলা, করতোয়া, পুনর্ভবা  প্রভৃতি নদ-নদী। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী ভারতের পূর্বাংশ কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার অন্তর্গত ছিল বর্তমান রংপুর তথা রঙ্গপুর অঞ্চল।রাজা ভগদত্তের সময় (খ্রিস্টপূর্ব ১৫শ' অব্দ) রংপুর প্রাগজ্যোতিষের অন্তর্গতছিল। আবার রাজা সমুদ্র গুপ্তের সময় (৩৪০ খ্রি.) কামরূপের করদরাজ্যে পরিগণিত হয়। পরবর্তীতে আবার এই অঞ্চল কোচবিহারের কিছু অংশ হিসেবে পরিচালিত হতো। ৪র্থ শতাব্দীর মধ্য থেকে এ অঞ্চল সর্বপ্রথম বর্মা রাজবংশের অন্তর্ভুক্ত হয়। কালক্রমে পালবংশ, সেনবংশ আরও অনেক রাজবংশ এখানে রাজত্ব করে।

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানী লাভের পর রংপুর নতুন ব্যবস্থায় ইংরেজ শাসনাধীন আসে। রংপুর অঞ্চলে সর্বপ্রথম ১৭৬৫ সালে কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে বিদ্রোহী সিপাহীরা। এ অঞ্চলে ইংরেজ শাসকদের মাঝে ত্রাসের সঞ্চার করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বপ্রথম কংগ্রেসের ডাকে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর এখানে উত্তরবঙ্গের কৃষক নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং নবেম্বরে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়।

নামকরণের ইতিহাস : রংপুরের রঙ্গপুর নামকরণের কারণ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন মহাভারতের সময়ে প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্তের রঙ মহল ছিল রংপুরে এবং সেই রঙ মহল হতে নাম হয়েছে রঙ্গপুর। কারো কারো মতে ভগদত্তের কন্যা পায়রাবতীর নামানুসারে নারী জাগরণের অগ্রদ্রুত বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি পায়রাবন্দের নামকরণ হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন রংপুরে বস্ত্ররঞ্জনী কারখানা ছিল। পাট নির্মিত বস্ত্রে বা চটে রং করা হতো বলে রংপুরকে রংরেজপুর বলা হতো এবং তার পরিবর্তে হয়েছে রঙ্গপুর (রংপুর)। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন রংপুরের নামকরণের ক্ষেত্রে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজীর অবদান গ্রহণযোগ্য। রঙ্গপুর শব্দটি ফার্সিশব্দ। আর তাই সঙ্গত কারণে বখতিয়ার শাসন আমলেই রংপুরের নাম রঙ্গপুর হয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান : রংপুর বিভাগ  বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ঐতিহ্যবাহী জনপদ। এই বিভাগের ভৌগলিক অবস্থান  ২৫ ডিগ্রী ৫০ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ৮৯ডিগ্রী ০০ মিনিট পূর্ব   দ্রাঘিমাংশ পর্যন্তবিস্তৃত। তিস্তা নদীর উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তকে লালমনিরহাট ওকুড়িগ্রাম জেলা থেকে পৃথক করেছে। রংপুর বিভাগের মোট আয়তন ১৬,৩২০.২৬ বর্গকিলোমিটার। ৮টি জেলা, ৫৮টি উপজেলা, ৫২৭টি ইউনিয়ন, ২৭টি পৌরসভা ও ১২,৫৪৯টি মৌজা নিয়ে জেলাটি গঠিত।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি : রংপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাহিত্যকর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি সুপ্রাচীন ও বিভাসিত। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলানিকেতন এই রংপুর। বলা যায়, প্রকৃতির রহস্যময়তায় নান্দনিক সৌন্দর্যে প্রকৃতির আদরনীয় হিল্লোলে ও প্রাণময়তায় ভরপুর রংপুর। অর্থাৎ‘রঙ্গরসে ভরপুর এই রঙ্গপুর'। এই রঙ্গরস শিক্ষা-সাহিত্য, সঙ্গীত, সংস্কৃতি ইতিহাস-ঐতিহ্যবিশেষ করে লোকসংস্কৃতি মিলিয়ে অনবদ্য। রঙ্গপুরের পরিবর্তিত রূপ রংপুর।বাংলাদেশের প্রাচীনতম অংশের নাম বন্দ্রে বা বরেন্দ্রী। রংপুর সমতল বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত। পরবর্তী সময়ে যে অঞ্চল গৌড় অঞ্চল বলে পরিচিতি লাভ করে।

প্রাচীন নিদর্শনাবলী ও দর্শনীয় স্থান : কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ভবন, পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার বাড়ি, মন্থনার জমিদার বাড়ি, কেরামতিয়া মসজিদ, রংপুর যাদুঘর, মাওলানা কারামাত আলী জৈনপুরী (রহ.)-এর মাযার, হযরত শাহজালাল বোখারীর মাযার, তাজহাট জমিদার বাড়ি, কুতুব শাহের মাজার, রায়পুর জমিদারবাড়ি, পাটগ্রামে রাজা নীলাম্বরের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, চন্দনহাট হরি মন্দির, ডিমলা রাজ কালী মন্দির ও মিঠাপুকুর যা মোগল আমলে খনন করা হয়েছে।

রংপুর বিভাগের প্রাচীন নিদর্শনাবলী ও  ঐতিহ্যঃ

১.রংপুর জেলা:

তাজহাট জমিদার বাড়ী, টেপার জমিদার বাড়ী, জেলা পরিষদ ভবন, রংপুর চিড়িয়াখানা, কারমাইকেল কলেজ, ভিন্ন জগত, বখতিয়ার মসজিদ, বড়বিল মসজিদ, চন্ডিপুর মসজিদ, ফুলচৌকি মসজিদ, মিঠাপুকুর মসজিদ, কেরামতিয়া মসজিদ, লালদিঘী মসজিদ, মহীপুর মসজিদ, ভাংনী মসজিদ, ডিমলা কালি মন্দির, ত্রিবিগ্রহ মন্দির, জমিদার অজিত রায়ের জমিদার বাড়ী, ইটাকুমারী জমিদার বাড়ী, দেয়ান বাড়ী জমিদারবাড়ী-ফনিভূষন মজুমদারের জমিদার বাড়ী, পীরগাছা জমিদার বাড়ী, পায়রাবন্দ জমিদার বাড়ী, রাজবাড়ী, চন্ডীপুর মসজিদ।

২. নীলফামারী জেলা:

অঙ্গরা মসজিদ, নীলসাগর, জেলা স্কুল, চিনি মসজিদ, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, তিস্তা ব্যারেজ, হাজী তালেঙ্গা মসজিদ, সৈয়দপুর ক্যাথলিক গীর্জা।

৩. দিনাজপুর জেলা:

স্বপ্নপুরী, সীতাকোট বিহারের বিভিন্ন কক্ষ, ঘোড়াঘাট প্রাচীন দূর্গ মসজিদ, নয়াবাদ মসজিদ, সুরা মসজিদ, কান্তনগর মন্দির, দিনাজপুর জমিদারবাড়ির সিংহদেউড়ী, পার্বতীপুর গণ কবর, পার্বতীপুর রেল ষ্টেশন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকমপ্লেক্স, দিনাজপুর যাদুঘর, রামসাগর, রামকৃষ্ঞ মিশন।

৪. পঞ্চগড় জেলা:

চা বাগান, ভিতরগড়, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, হরেন সাহা শিব মন্দির, ঐতিহাসিক কাজল দীঘি, রক্স মিউজিয়াম।

৫.ঠাকুরগাঁও জেলা:

জামালপুর জমিদার বাড়ী মসজিদ, পীরগঞ্জ শিব মন্দির, রাজা ঠাকনাথ রাজবাড়ী।

৬.গাইবান্ধা জেলা:

মাস্তা মসজিদ, পাড়াকচুয়া মসজিদ, বর্ধনকুঠি জমিদার বাড়ী, রংপুর চিনিকল।

৭. কুড়িগ্রাম জেলা:

চান্দামারী মসজিদ, দোলমঞ্জ মন্দির, পাঙ্গা জমিদার বাড়ী, চিলমারী বন্দর, মুনসীবাড়ী।

৮.লালমনিরহাট জেলা:

নিদাড়িয়া মসজিদ, তুষভান্ডার জমিদার বাড়ীর কালি মন্দির, কাকিনা জমিদারবাড়ী, সুকান দিঘী, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ স্মৃতি বিজড়িত বিমানঘাটি, তিস্তা সেতু, তিন বিঘা করিডোর, বুড়িমারী স্হল বন্দর।  


Share with :

Facebook Twitter