Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন
Main Comtent Skiped

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

রংপুরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব : খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ


গত শতাব্দীর রংপুরের অন্যতম বরেণ্য ব্যক্তি শাহ্‌ আব্দুর রউফ ১৮৮৯ সালে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মকিমপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাহ্‌ কলিম উদ্দিন সাহেবের ধন সম্পত্তির চাইতে বেশী ঝোঁক ছিল রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম এসবের প্রতি। ছিলেন আধুনিক মনের মানুষ। রাজনৈতিক ভাবে ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। বঙ্গ ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। সেই সময়েই তিনি ছিলে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য প্রকাশনা হচ্ছে কুলপ্রদীপ, হেদায়েত জায়দান, মেফতাহুস সালাত ও ধূর্ত শৃগাল। এই ধূর্ত শৃগাল মূলত ব্রিটিশ বিরোধী একটি রূপক গ্রন্থ। নিজে একজন বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিধায় তাঁর সন্তানদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা অসম্পূর্ণ থাকেনি। তাঁর উত্তরাধিকারদের মধ্যে তিনি জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিলেন শিক্ষার আলো। এক কথায় তিনি ছিলেন একজন সাত্ত্বিক পুরুষ। শাহ্‌ কলিম উদ্দিন সাহেবের পনেরো সন্তানের (৯ পুত্র, ৬ কন্যা) মধ্যে পঞ্চম পুত্র শাহ্‌ আব্দুর রউফ।

শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেব আলীগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রী লাভ করেন এবং আইন পেশায় নিয়োজিত হন। পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন ১৯৪০ সালে। তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বা আইনজীবী হিসেবেই নন একজন সাহিত্যিক, সমাজসেবী এবং শিক্ষানুরাগী হিসেবেও খ্যাতির অধিকারী ছিলেন। তবে তাঁর মূল পরিচয় তিনি একজন রাজনীতিক। পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতীয় মুসলিমদের জন্য একটা পৃথক আবাস ভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন একজন মুসলিম লীগ আদর্শের অনুসারী হিসেবে।

১৯১৯ সালে রংপুরে সংঘটিত হয় রায়ত আন্দোলন। ব্রিটিশ প্রবর্তিত কুখ্যাত জমিদারী প্রথার ফলে বাংলার কৃষক ছিল শোষিত, নির্যাতিত। জমিদারদের শোষণ ও নির্যাতনের জাত থেকে কৃষকদের রক্ষা ও শোষণের বিরুদ্ধে রংপুরে রায়ত সমিতি গড়ে উঠলে শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেব সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রংপুর অঞ্চলের আরেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বর্তমান লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার শেখ রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। ১৯১৯ সালের শাসন সংস্কার আইন অনুযায়ী বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে। ১৯২০ সালে সেই নির্বাচনে তিনি রংপুর সদর ও নীলফামারী মহকুমার (বর্তমান জেলা) মুসলিম ভোটারদের ভোটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এম.এল.সি) নির্বাচিত হন। দেশ বিভাগের পরে ১৯৬০ সালে তিনি রাজশাহী বিভাগীয় কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন সরকার কর্তৃক। ১৯৬২ সালে "মৌলিক গণতন্ত্র" প্রথা চালু হলে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তিনি সম্মানসূচক "তঘমায়ে কায়েদে আযম" উপাধি লাভ করেন।

শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেবের দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র ছিল জেলা পরিষদ। ১৯২২ সালে প্রথম জেলা বোর্ডের সদস্য হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরে ১৯৩৩ সালে সদর লোকাল বোর্ড কর্তৃক আবারও জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর নভেম্বরে তিনি জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর তিনি উক্ত পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর তৃতীয় কর্মক্ষেত্র ছিল রংপুর সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক। ১৯২৯-৩৪ সাল পর্যন্ত তিনি রংপুর কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অনানারী সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্যাংকের ডেপুটি চেয়ারম্যান। জনসাধারণকে উপকৃত হবে এই মানসে তিনি সমবায় আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এই সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে জনসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৩৫ সালে তিনি জুবিলী মেডেলসহ জুবিলি কো-অপারেটিভ সার্টিফিকেট লাভ করেন। জনকল্যাণে আজীবন কাজ করে যাওয়া এ্যাডঃ শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেব প্রশংসনীয় জনহিতকর কাজের জন্য ১৯৩৭ সালে তৎকালীন বড় লাট বাহাদুরের কাছে থেকে করোনেশন মেডেল এবং এর দুই বছর পরে ১৯৩৯ সালে তিনি সরকার কর্তৃক খাঁন বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন।

একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি হিসেবে দেশ ও জাতি গঠনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বিপুল জনগোষ্ঠীর মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশ বিভাগের পরে ১৯৪৭ সালে জেলা বিদ্যালয় বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সুনামের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ উপলব্ধি করেছিলেন রংপুরে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম। চিকিৎসার সু ব্যবস্থার জন্য রংপুরে একটি মেডিকেল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। সেই লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে জেলা বোর্ড হতে নিজে আহবায়ক হয়ে একটা সভা আহ্বান করেছিলেন। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সি.এ আলীর সভাপতিত্বে সেই সভায় রংপুরের সুধী ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটেছিল। সকলেই মেডিকেল স্কুল স্থাপনের ব্যাপারে খান বাহাদুর সাহেবের প্রচেষ্টাকে অভিনন্দিত করেন এবং সেই সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে একটি মেডিকেল স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। মৃত্যুর আগে তিনি দেখে যেতে পারেননি ২৪ বছর আগে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তরিত হতে। তাঁর মৃত্যুর পরেই রংপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি নিজেকে সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১৯৩৭ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ "চতুর্দশী" ও ১৯৪০ সালে "আমার কর্মজীবন" নামে আত্মজীবনীমুলক বই প্রকাশিত হয়।

দিনাজপুর ও রংপুরের প্রসিদ্ধ উচ্চ শিক্ষিত পীর হযরত মাওলানা শাহ্‌ আফতাবুজ্জামানের (ধলা পীর নামে পরিচিত) মুরিদ ছিলেন। শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেবের অর্থানুকূল্যে মাওলানা শাহ্‌ আফতাবুজ্জামান রচিত "বরকতের নূর" ও "নাতে রসুল মকবুল" গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয়। এভাবেই আজীবন জনহিতকর কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন তিনি। আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে ১৯৬৯ সালের প্রথম দিনে অর্থাৎ ০১ জানুয়ারী রংপুর শহরের লিচু বাগান এলাকায় (সালেক পাম্প) তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন তিনি। শহীদ শংকু সরণীস্থ (ষ্টেশন রোড) আলমনগর পানামা মোড়ে ধলা পীর সাহেবের "বরকতিয়া দরবার শরীফ" সংলগ্ন এলাকায় তাঁকে দাফন করা কয়। সেখানেই পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ ও তাঁর সহধর্মিণী মোছাঃ সালেমা বেগম। মৃত্যু - ৩০ মার্চ ১৯৭৭ ইং। খান বাহাদুর এ্যাডঃ শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেবের স্বরচিত নীচের কয়েকটি লাইন তার কবরের এপিটাফে লেখা আছে।

"দুনিয়ার চাকচিক্যে ভুলো নারে মন
অতীব অস্থায়ী ইহা রাখিও স্মরণ,
জীবন ক্ষণস্থায়ী ও মৃত্যু সুনিশ্চিত
বৃথা নষ্ট করা জীবন নয়ে কো উচিৎ"।

খান বাহাদুর সাহেবের সহধর্মিণী মোছাঃ সালেমা বেগমের নামানুসারে রংপুরের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সালেমা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়। ঐ স্কুল বর্তমানের ক্যাম্পাসে (গুপ্ত পাড়া) যাওয়ার আগে খান বাহাদুর সাহেবের বাসার এক অংশেই ছিল অনেক দিন। তখন ঐ স্থানটিকে বলা হতো লিচু বাগান। সালেক পাম্প ও সোনালী ব্যাংকের মাঝ দিয়ে যে রাস্তা সেন পাড়ায় ঢুকেছে সেই রাস্তার ৪০-৫০ গজ দূরত্বে সালেমা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি এখনও আছে। এছাড়া পীরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের নামকরণ করা হয়েছে খান বাহাদুর সাহেবের নামেই। কলেজটির নাম খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ কলেজ। পীরগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় যার নাম কছিমুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেটার নামকরণ করা হয়েছে খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেবের মাতা মোছাঃ কছিমুন্নেছা খানমের নামে। রংপুরের স্বনামধন্য রাজনীতিক ও সালেক পেট্রোল পাম্পের মালিক প্রয়াত আলহাজ শাহ্‌ আব্দুস সালেক তাঁর বড় পুত্র। এবং সালেক পাম্পটাই খান বাহাদুর শাহ্‌ আব্দুর রউফ সাহেবের বাসা।

তথ্য সূত্র :
রংপুরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব : সম্পাদিত, রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদ
তুমি আমাদেরই লোক : সম্পাদিত, কামরান শাহ্‌ আব্দুল আউয়াল স্মারক গ্রন্থ।

 

আলহাজ্ব মোহাম্মদ তৈমুরঃ

 

দিনাজপুরের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় কৃতি সন্তান, প্রাথমিক যুগের অগ্রণী শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিভাগীয় উচ্চ কর্মকর্তা আলহাজ্ব মোহাম্মদ তৈমুর দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজার মহল্লার অধিবাসী ছিলেন। উক্ত মহল্লায় তার প্রাচীন ধরনের বাসভবন এখনও অবস্থিত।

 

ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বুজর্গ ধার্মিক, ন্যায়পরায়ন, সরল ও অমায়িক ব্যক্তিত্বের অধিকারী অত্যন্ত জ্ঞান পিপাসু ও ইসলামী সাহিত্য চর্চার নিবেদিত গবেষক। কোরআন প্রবেশিকা ‘তারা জানেনা ইসলাম কি’ মুসলমানের তেত্রিশ কোটি দেবতা’ প্রভৃতি মূল্যবান গ্রন্থেও লেখক রূপে তিনি একজন যশস্বী ব্যক্তিত্ব।

 

যে কালে শিক্ষার ব্যাপারে দিনাজপুরে ছিল ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ এর যুগ, তখন তিনি শিক্ষা প্রচারে অগ্রণী ছিলেন। চাকুরী জীবনে তিনি মক্তব মাদ্রাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠা কল্পে গ্রামের জনসাধারণকে উৎসাহিত করেন এবং প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলির মঞ্জুরীদানের ব্যবস্থা করে দেন। সেই যুগেও তিনি নারী শিক্ষায় অগ্রণী ছিলেন। তার ছেলে ও মেয়েরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষিত এবং চাকুরী ক্ষেত্রে উচ্চতর আসনের অধিষ্ঠিত। শেষ বয়সে তিনি চিকিৎসার জন্য কলিকাতায় যান এবং তথায় মৃত্যুবরণ করে। তিনি ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

স্বভাব কবি মোঃ নূরুল আমিন

মোঃ নূরুল আমিন। একজন স্বভাব কবি। দিনাজপুরের সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অন্যতম প্রথিকৃৎ। এই কবি আজ মহা নিদ্রায় শায়িত। তিনি জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানাধীন ঘোনাপাড়া গ্রামে এক বনেদী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা অলিমুদ্দীন সরদার এবং মাতা মোওলাতুন্নেছা পরিবিবি। স্কুল জীবন হতে তাঁর কাব্যচর্চা শুরু হয়। তিনি ১৯৩১ সালে গুরু ট্রেনিং পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে কলকাতা শিক্ষা বোর্ডের মেধা তালিকায় ১৭তম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু গুরুগিরি তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমনে। ১৯৪৫ সালে দিনাজপুর এসে পৌঁছেন এবং সবুজ শ্যামলিমার কারুকাজ খচিত দিনাজপুরের প্রেমে পড়ে যান প্রথম দর্শনেই। স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন দিনাজপুরের পাহাড়পুরে।

 

কবি মোঃ নূরুল আমিন ছিলেন সহজাত কবি এবং সাংবাদিক। সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দিনাজপুরের তখন শৈশবকাল। সবেমাত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করছে সাহিত্যের আড্ডাখানা। সুনির্দিষ্ট কোন ঠিকানায় নয়, কবি মোঃ নূরুল আমিনসহ সমমনা কয়েকজন বসতেন মুন্সিপাড়া দবিরের চায়ের দোকানে, গাছের তলায় ঘাসের কার্পেটে বা কোন কবি-সাহিত্যিকের আসরে। চলত কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর কিংবা প্রবন্ধ পাঠ। এই আড্ডাখানায় যারা আড্ডা দিতেন তাদের মধ্যে ছিলেন কবি কাজি কাদের নেওয়াজ, বিশিষ্ট সমাজসেবী মঈনুদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী, কবি মোঃ নূরুল আমিন, খাজা নাজিমুদ্দিন হল লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব হেমায়েত আলী, কবি সোলেমান আলী, অধ্যাপক সোলেমান, ঐতিহাসিক মেহেরাব আলী, কবি আ.ক.শ নূর মোহাম্মদ, কবি ফুলুমদ্দীন মন্ডল, ডা. মাহাতাব উদ্দীন আহম্মেদ, কবি রসরাজ আহমাদ হোসেন, সুফী কবি আব্দুল জববার প্রমুখ। আড্ডাখানা বসত কোন নির্দিষ্ট সময় ধরে নয়। সাধারণতঃ বিকেলে বা সন্ধ্যায়।

 

কবি মোঃ নূরুল আমিন এবং তার সমমনা বন্ধুদের সাহিত্য আড্ডাকে ঘিরে একদিন পদযাত্রা শুরু হয়েছিল কবি-সাহিত্যিকদের। সেই শোভাযাত্রায় আজ অনেক প্রতিভাধর কবি সাহিত্যিক গড়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন কবি মোঃ নূরুল আমিন। দেশ স্বাধীন হবার পরও দিনাজপুরের সাহিত্য চর্চার এই মানুষটি সাহিত্যিক গঠনের কর্মী হিসেবে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি গঠন করেন ‘‘নওয়াজ সাহিত্য মজলিশ’’। তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের তিনি আমৃত্যু উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন লিখতে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠতে। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে দিনাজপুর দর্পন কাব্য, নবী কাহিনী, সৃষ্টির বিচিত্র লীলা, গুঞ্চায়ে উম্মিদ, নতুন ছড়া, ছেলেমেয়েদের প্রথম পাঠ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রায় ৩০০ শতাধিক পান্ডুলিপি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী পুড়ে দেয়।

 

কবি মোঃ নূরুল আমিন শুধু দিনাজপুরের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেই পথিকৃৎ ছিলেন না, সাংবাদিকতা চর্চার ক্ষেত্রেও তিনি পালন করে গেছেন অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৫৮ সাল হতে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের দিনাজপুর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। এ সময়ে দিনাজপুরে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন গুটি কয়েক ব্যক্তি। এঁরা হলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অধ্যক্ষ মোকাররম হোসেন, তাজমিলুর রহমান, আনোয়ারা রহমান, মাসুমা খাতুন, কবি মোঃ নূরুল আমিন, নেহাল আক্তার, মেহেরাব আলী, এ হেমায়েত আলী, আব্দুল বাড়ী ও বশির উদ্দিন প্রমুখ। দিনাজপুরে সাংবাদিকতার বীজ বপনকাল হিসেবে এই সময়টাকেই ধরা হয়। ১৯৬৫ সালে দিনাজপুর প্রথম গঠন করা হয় প্রেসক্লাব। সেই প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন কবি মোঃ নূরুল আমিন। তবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুর রউফ চৌধুরীর মতে কোন আওয়ামী লীগের সদস্য প্রেসক্লাবের সভাপতি হলে গভর্নর মোনেম খান সেই প্রেসক্লাবের উদ্বোধন করবেন না। তবে মুসলিম লীগের কোন সদস্যকে সভাপতি করলে গভর্নর সে অনুষ্ঠানে আসবেন। সে কারণেই কবি মোঃ নূরুল আমিন স্বেচ্ছায় সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তৎকালীন সদর মহকুমা মুসলিম লীগের সম্পাদক তাহের উদ্দিন আহম্মেদকে সভাপতি করা হয়। উদ্বোধনের কিছু দিন পরেই কবি মোঃ নূরুল আমিনকে দিনাজপুর প্রেসক্লাবের আবারো সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। কবি মোঃ নূরুল আমিন দীর্ঘ একযুগ (১৯৬০-১৯৬৪) প্রেসক্লাবের সাথে জড়িত থেকে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংবাদিকদের। দিনাজপুরে সাংবাদিকতা বিকাশের ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

দিনাজপুরে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি মোঃ নূরুল আমিন ২০০০ সালের ২২শে নভেম্বর সকাল ৮.৩০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। দিনাজপুরের আপামর জনসাধারণ তাঁকে চিরদিন গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

 

 

পন্ডিত মহেশচন্দ্র তর্কচুড়ামনিঃ

 

ভারত বিখ্যাত সংস্কৃত পন্ডিত ছিলেন এবং ছিলেন দিনাজপুর রাজপুরোহিত ও সভাপন্ডিত। বহু সংস্কৃত কাব্যের লেখক পন্ডিত মহাশয়ের খ্যাতিপূর্ণ গ্রন্থ ছিল ‘রাজবংশনম’’। এছাড়া আরো একখানা জ্ঞাগর্ভ সংস্কৃত কাব্যের লেখক ছিলেন তিনি। অধ্যাপক প্রিয়বন্ধন সেন, পি.আর.এম রচিত western influence on Bengali literature.নামক বিখ্যাত গ্রন্থে তদীয় প্রজ্ঞা ও আকরিব জ্ঞান গরিমার আলোচনা স্থান পেয়েছে। তারা জন্ম হয় ১৮৪১ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৭ সালে পরিণত বয়সে। শহরের পূর্ব উপকন্ঠে রাজারামপুর গ্রামে তার বাসভূমি ছিল।

 

 

জেহের উদ্দিন মোক্তারঃ

 

মুন্সীপাড়া নিবাসী। দিনাজপুর বারে লদ্ধ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি, প্রভাবশালী মুসলমান সমাজপতি, সেকালে উদযাপিত মহরম উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠাপোষক এবং সমকালীন রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সস্পৃক্ত শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জনসেবার কাজে বহুবার তার নাম মাসিক দিনাজপুর পত্রিকায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বিংশ শতকের প্রথম দশকে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

পীর শাহ সুফি মতলুব মিয়াঃ

 

পেশা জীবনে ছিলেন পুলিশ অফিসার কিন্তু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন সুফিতত্ব সাধনায় অসাধারণ বুজর্গ পীর মোকাম্মেল ও ইসলাম প্রচারক। হজরত খাজা বাবার খাদেমকহলের একজন। শাহ মতলুব মিয়ার অগনিত মুরিদান ও আশেকান ছিল দেশের সর্বত্র। তিনি অলৌকিক কেরামতধারী ছিলেন এবং একালেও যে সব কেরামতির অসংখ্য গল্প কাহিনী ছড়িয়ে আছে লোক পরম্পরায় যা প্রামাণ্য সত্যের মতোই বিশ্বাসযোগ্য।

 

 

নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার শ্রী শিবপ্রসাদ করঃ

 

স্বনামধন্য নাট্যাভিনেতা, নাট্যকার, মঞ্চাধ্যক্ষ নাট্য সংগঠক ও ক্রীড়াপরিচালক শিব প্রসাদ কর ছিলেন গণেশতলা মোড়ের কর বংশীয় জমিদার পরিবারের কৃতি সন্তান। দিনাজপুর নাট্য সমিতি ছিল তার নাট্যচর্চা ক্ষেত্র। এক পর্যায়ে মাসিক দিনাজপুর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন (১৯৪২-৪৫)। দে শ বিভাগের পর বালুরঘাটে উদ্বাস্ত্ত হন। তিনি ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

খাঁন বাহাদুর মাহতাব উদ্দিন আহমদঃ

 

জেলার প্রথম দিকের মুসলমান শিক্ষাবিদ, বিভাগীয় স্কুল ইন্সপেক্টর মাহতাবউদ্দিন আহমদ যে কালে সরকারী উচ্চ পদে চাকুরীজীবি তখন ঐসব পদে মুসলমানের সংখ্যা সামান্যই ছিল। তাই তিনি মুসলমান সমাজের গর্বের পাত্র ছিলেন। সমানই গৌরবের কারণ ছিলেন খাঁনবাহাদুর উপাধি পাওয়ায়। চাকুরী থেকে অবসর হয়ে জেলার রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং প্রথম পদক্ষেপেই জেলাবোর্ডের চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা বিশিষ্ট আইনজীবী মির্জা কাদের বক্সকে পরাজিত করে প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য হন । সৎ, সদালাপী ও পরোপকারী এই মানুষটি জনগণের এতই মন জয় করতে পেরেছিলেন যে, তখন তার নামটি ছিল সবার মুখে মুখে। দিনাজপুর শহরের কসবায় তার বাস ভবন ছিল। তিনি ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

শ্রী মাধব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ঃ

 

দিনাজপুর জেলা শাখা কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৮৯০ সালে স্থাপিত) ও দিনাজপুর বারের আইনজীবি শ্রীমাধব চন্দ্র  দিনাজপুর শহরের বড়বন্দর মহল্লার অধিবাসী ছিলেন। তার বড়বন্দর বাসায় আহুত জনসভায় ১৮৯০ সালে ইংলান্ড দেশাগত প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার মিং মর্গানোর উপস্থিতিতে জেলা কংগ্রেস শাখা গঠিত হয়। বারের প্রাথমিক যুগের ইংরেজী নবিশ উকিলদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও সমাজ সেবক রূপে তার প্রচুর সুনাম ছিল। তিনি এক পর্যায়ে বারের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

মাওলানা আয়েন উদ্দিন আহমদঃ

বিগত শতকের দিকে বিশ ত্রিশ দশকে তিনি লালবাগ আরবী মাদ্রাসার দীর্ঘকালীন শিক্ষক ছিলেন। কলিকাতা নিবাসী মওলানা আয়ন উদ্দিন আরবী সাহিত্যে এবং বিশেষ করে কোরআন, হাদিস, ফেকা প্রভৃতি শাস্ত্রে অসাধারণ আলেম ছিলেন। ইসলাম প্রচারেও তার সবিশেষ সুখ্যাতি ছিল।

 

 

ডাঃ সুকুমার সেন গুপ্তঃ

 

বৃটিশ আমলে দিনাজপুর থেকে প্রথম ব্যাচে যে ডাক্তারগণ এম বি পাশ করেন তাদের একজন কৃতি ডাক্তার ছিলেন সুকুমার সেন গুপ্ত। যখন জেলায় কোন বিশেষ রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই ছিল না তখন ডাঃ সুকুমার ছিলেন একজন কালাজ্বর বিশেষজ্ঞ। ঐ সময় দিনাজপুরে কালাজ্বরের প্রচন্ড ব্যাপকতা ছিল। এই রোগ চিকিৎসায় তিনি প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন। দিনাজপুর শহরের ঘাসিপাড়ায় তার বাসভবন ছিল।

 

তিনি অত্যন্ত গোলাপ ফুলের চাষবিলাসী ছিলেন এবং বাড়ীর উঠানে উন্নত জাতের ফুল চাষ করতেন। ৪৭ এর পর উদ্বাস্ত্ত হয়ে বালুরঘাটে উপনিবিষ্ট হন। তিনি ১৯৮১ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

অধ্যাপক আব্দুল বাকীঃ

দিনাজপুরবাসী (বৃহত্তর) মুসলিম সমাজের প্রথম যুগের উচ্চ ডিগ্রীধারী শিক্ষাবিদ রূপে অধ্যাপক আব্দুল বাকী ছিলেন দিনাজপুরের গৌরব। যে কালে মুসলমান সমাজে সামান্য লেখাপড়ার প্রচলন প্রায় অনুপস্থিত ছিল সেই অন্ধকার যুগে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আব্দুল বাকী কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা পাশ করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবী ভাষা-সাহিত্যে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার তথা রেকর্ড ভঙ্গকারী নম্বর পেয়ে এম এ পাশ করেন; তদুপরি অসাধারণ কৃতিত্বের পুরস্কার স্বরূপ স্বর্ণ পদক লাভ করেন (১৯৩২)। তিনি সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করেন আমৃত্যু। কলেজের সাধারণ দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক গবেষক ও লেখক। আরবী, ফার্শি, ইংরেজী, বাংলা ও উর্দুতে ছিল গভীর পড়াশোনা ও পান্ডিত্ব। বাংলা ছাড়াও প্রবন্ধ লিখতেন ইংরেজীতে। কবি ইকবাল দর্শনে প্রভাবিত অধ্যাপক বাকী ইকবাল কাব্য নিয়েও গবেষণা করেন এবং তৎসংক্রান্ত বহু জ্ঞানগর্ভ নিবন্ধ প্রকাশিত হয় বহু পত্র-পত্রিকায়। লোকনন্দিত বক্তাও ছিলেন তিনি। তিনি এমন সরল সাবলীল মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন, যা শুনে শ্রোতারা আকর্ষিত না হয়ে পারত না। তার কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। পশ্চিম দিনাজপুর থেকে উদ্বাস্ত্ত হয়ে অত্র শহরের বালুয়াডাঙ্গায় অভিবাসিত হন। দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৯৮১ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

শ্রী প্রেমহরি বর্মনঃ

দিনাজপুর থেকে প্রথম সম্মানীয় মন্ত্রীপদ প্রাপ্ত প্রেমহরি বর্মন ছিলেন জেলা তফশিলী সম্প্রদায়ের নেতা ও তফশিলী সমাজের প্রথম উচ্চ শিক্ষিত তথা ঐ সম্প্রদায় থেকে আসা বারের প্রথম আইনজীবীও। ১৯৩৭ সালে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে প্রাদেশিক আইন সভার মন্ত্রী পদ লাভ করেন। ১৯৪৬ এর গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সময় তফশিলী সম্প্রদায় মুসলিম লীগ দলের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করায় তিনি তফশিলী ফ্রন্টের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন। অতি সরল, বিনয়ী ও সৎ চরিত্রের মানুষ মিঃ বর্মন কালীতলা নিবাসী ছিলেন। তিনি ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

জয়নব রহিমঃ

তিনি দিনাজপুরের প্রথম মুসলমান মহিলা গ্র্যাজুয়েট জয়নব রহিম ঘাসীপাড়া নিবাসী সাবরেজিস্ট্রার আব্দুর রহীমের কন্যা ও কসবার খাঁন বাহাদুর মাহতাবউদ্দিন আহমদের পুত্রবধূ ছিলেন। কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পর জয়নব রহীম কলিকাতা কর্পোরেশনের পরিচালনাধীন স্কুল পরিদর্শিকা নিযুক্ত হন এবং তার আজীবন কর্মক্ষেত্র ছিল কলিকাতা। তদীয় স্বামী ডাঃ মোতাহার উদ্দিন আহমদও ছিলেন কলিকাতা কর্পোরেশনের মেডিক্যাল অফিসার। তিনি ১৯৮০ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

ডাক্তার সারদা কান্ত রায়ঃ

শহরের প্রাথমিক ডাক্তারগণের অন্যতম ছিলেন। এল,এম,এফ পাশ ডাক্তার হয়েও তিনি চিকিৎসা ব্যবসা করেন হোমিও পদ্ধতিতে। তখন শহরের সবেমাত্র হোমিও চিকিৎসা প্রবর্তন হয়। তিনি গভীর পড়াশোনা ও কঠোর সাধনায় উক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এমন প্রজ্ঞা পান্ডিত্য অর্জন করেন যে জেলার অদ্বিতীয় চিকিৎসকের মর্যাদা লাভ করেন। হোমিও চিকিৎসা বিষয়ে তিনি সুপন্ডিত এবং সুলেখকও ছিলেন।

 

 

ডাঃ হাজী মফিজউদ্দিন আহমদঃ

দিনাজপুরে মুসলমান ব্যবসায়ী হিসেবে প্রসিদ্ধ ঔষধ বিক্রেতা মফিজউদ্দিন আহমদ বহু অধ্যাবসায়ের বলে শহরে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। তার প্রতিষ্ঠিত ঔষধ ব্যবসার নাম ছিল বেঙ্গল মেডিক্যাল স্টোরস। ঔষধ ব্যবসা বাদেও ছিল বিভিন্ন ঠিকাদারী ব্যবসা এবং সময়ের হাওয়া অনুকূল থাকায় (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কাল) তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হন। এমনকি অর্থবিত্তে শহরের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির পংক্তিতে উন্নীত হন। মুন্সীপাড়ায় একটি ছাপাখানা (বেঙ্গল প্রেস) প্রতিষ্ঠা করেন (১৯৩৫) যা ছিল শহরে মুসলমান প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্রেস। তীক্ষ্ণ মেধা ও সূক্ষ দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যস্ত ব্যবসায়ী হয়েও তার জ্ঞান পিপাসা ছিল অসাধারণ। হাদিস কোরআন বিষয়ক জ্ঞানের অনুসন্ধিৎসায় তিনি আরবী ভাষায় স্বশিক্ষিত আলেমের দরজা লাভ করেন। আরবী, উর্দু ও বাংলা ভাষায় প্রচুর গ্রন্থাদির সংগ্রহ সমৃদ্ধ তার একটি পারিবারিক লাইব্রেরী ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী ও উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন এবং ধার্মিক মুসলমান রূপে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছিলেন। তিনি ১৯৮৬ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

কবি নূর মোহাম্মদঃ

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর প্রাথমিক যুগের বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি নুর মোহাম্মদ। তিনি মূলতঃ কবি হয়েও গান, উপন্যাস, নাটক, জীবনী, প্রবন্ধ প্রভৃতি রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। গৌড়বঙ্গ সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা, নওরোজ সাহিত্য মজলিশের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এবং অনেক কাব্য, উপন্যাস, ইতিহাস, জীবণী গ্রন্থের লেখক ছিলেন। তিনি ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দ জন্মগ্রহন করেন এবং ১৯৮৪ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

মির্জা কাদের বকস্

মির্জাপুরের বিখ্যাত মির্জা পরিবারের কৃতিসন্তান কাদের বক্স জেলা বারের একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠ আইনজীবি ছিলেন। মুসলিম লীগ জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯১৫-১৬), বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য (এমএলসি), জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান প্রভৃতি বহু দায়িত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব ছাড়াও সমকালীন বহু সামাজিক সংস্থা, সংগঠন, বিশেষ করে শিক্ষা বিস্তারে একজন অক্লান্ত পরিশ্রমী ও উদ্যোক্তা ছিলেন। সাহসিকতা, নির্ভিক কন্ঠ ও স্পষ্টবাদীতা ছিল তার সহজাত চরিত্রগুণ। সেজন্য তাকে বলা হতো দিনাজপুরের সিংহ পুরুষ। তিনি যে কালের মানুষ তখন দেশে প্রবল সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিদ্বেষ ছিল। কিন্তু সমাজ মনের সেই দুরবস্থাটি তার কাছে ছিল অপ্রীতিকর ও অসহ্যকর। সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেলেই তিনি প্রতিপক্ষকে ছুঁড়ে মারতেন রুঢ়তম উচিত কথা। স্বীয় সমাজের দাবী আদায়ের পটভূমিতেও তিরন ছিলেন আপোশহীন নেতা। এ নিয়ে প্রচলিত প্রচুর ঘটনাও গল্প কাহিনীর দর্পণে ভাস্বর হয়ে আছে তার সত্যিকারের পরিচয়। বালুবাড়ীতে স্বীয় বাসভবনের মসজিদটি (সাবেক মসজিদ) তারই আমলে নির্মিত হয়। তিনি ১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

গোলাম রব্বানী আহমেদঃ

প্রথম দিকের জেলাবাসী মুসলমান উচ্চ শিক্ষিতদের অন্যতম বিশিষ্ট মেধাবী শিক্ষাবিদ গোলাম রব্বানী স্কুল পরিদর্শক ছিলেন। বিজ্ঞ ইংরেজী ভাষাবিদ বলে চাকুরী মহলে তার প্রচুর সুনাম ছিল। চাকুরী থেকে অবসরান্তে তিনি রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯৪২ সালে সদর এলাকার উপ-নির্বাচনে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য হন। স্বল্পকালীন রাজনৈতিক জীবনে জনসাধারণের জন্য বড় কিছু সুবিধা করতে পারার আগেই ১৯৪৬ এর গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আসে। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন। দিনাজপুর সদর উপজেলার পাটুয়াপাড়ায় তার বাস ভবন ছিল। তিনি ১৯৬১ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

চারণ কবি আমিরুদ্দিন সরকারঃ

কবি গানের সরকার রূপে জনপ্রিয় ছিলেন তদীয় জীবদ্দশায়। বিশেষ করে গণ মানুষের কবিয়াল ছিলেন। শতাধিক কবিতা পুস্তক রচনা করেন। তবে পুস্তিকা মাত্রই ১০/১৫ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। যেমনি চেহারায়, তেমনি কথাবার্তায়, কবিতা পাঠে মজলিশে ও কবিগাণের আসরে ছিলেন রসিক মানুষ। বার্ধক্য বয়সে আশির দশকে পাটুয়াপাড়ায় ইন্তেকাল করেন। ত্রিশ চল্লিশ দশকের সুকন্ঠ গায়ক মোঃ নুরুল ইসলাম ছিলেন তারই পুত্র। তিনি আশির দশকে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

ডাঃ আনোয়ারা খাতুনঃ

ক্ষেত্রীপাড়ার খাঁ বংশীয় চৌধুরী পরিবারের আত্মবংশীয় কৃতি কন্যা আনোয়ারা খাতুন দিনাজপুর তথা বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম মহিলা ডাক্তার। ১৯৪২ সালে কলিকাতা থেকে এম বি পাশ করেন এবং পরে লন্ডন রয়েল কলেজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। তার আজীবন কর্মক্ষেত্র কলিকাতা। কলিকাতার পার্কভিউ নার্সিং হোম এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালিকা রূপে তিনি আজীবন মানুষের চিকিৎসায় নিয়োজিত থেকে প্রচুর খ্যাতি ও কৃতিত্বের অধিকারী। তার কৃতিত্ব জেলাবাসীরই গর্ব ও গৌরব। তিনি ১৯১৯ সালে জন্ম গ্রহন করেন।

 

 

রহিম উদ্দিন আহমদঃ

দিনাজপুর বারের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি রহিমউদ্দিন আহমদ ছিলেন দুটি যুগান্তকারী কর্মকান্ডের আলোকে দিনাজপুরের ইতিহাসে স্বনামধন্য। ২১ এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দিনাজপুরের ভাষা বিপ্লবীদের কর্ণধার ছিলেন তিনি এবং পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের যদৃচ্ছা শোষণ ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধীতায় মওলানা ভাষাণীর ডাকে জেলা আওয়ামী লীগ গঠনের ভূমিকায় দুঃসাহসিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই। কাজেই তিনি একাধারে ছিলেন জেলা পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের ভাষা-সেনাপতি, তদ্রুপ জেলা পর্যায়ে আওয়ামী লগি সংগঠনের জনকও। দিনাজপুর জেলার তিনি প্রথম নেতা যার কন্ঠে ছিল বিপ্লবী প্রতিবাদী সুর এবং অযৌক্তিক ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর থেকেই যার অবস্থান ছিল বিরোধীয় মঞ্চে। ১৯৫৩ সালে তারই নেতৃত্বে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগ গঠিত হয় এবং তার প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট দলের এম, পি হন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাষা আন্দোলদের নেতৃত্ব দেয়ার রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে জেলায় প্রথম কারারুদ্ধ হন। তার প্রতিবাদী নেতৃত্বেও জন্য বরাবর বিব্রতকর অবস্থায় ভুগতেন পাকিস্তানী জেলা প্রশাসক। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ের কোন এক সময় থেকে রাজনৈতিক কর্মকোলাহলের প্রতি তার মানসিক স্বচ্ছন্দতাবোধের অভাব দেখা দেয়ায় তিনি রাজনীতি ছেড়েই দেন। বারের যোগাযোগটুকু রক্ষা করে চলেন শুধু। তিনি ১৯৮১ খ্রীষ্টাব্দেমৃত্যু বরণ করেন।

 

 

ডাক্তার নইমউদ্দিন আহমদঃ

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিমনা, স্বাধীনতাকামী ও সামাজিক উন্নয়নমুখী কর্মধারায় আজীবন সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নইমউদ্দিন আহমদ জেলার একজন বিশিষ্ট ও সস্মানীয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৪০ সালে তিনি কলিকাতা থেকে ডাক্তারী (এলএমএফ) পাশ করেন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও আত্মনিয়োগ করেন রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারায় ও সমাজসেবা কাজে। সময়টা ছিল কংগ্রেস, লীগ ও তেভাগা আন্দোলনের লক্ষ্যে পৌছানোর চূড়ান্ত সক্রিয়তার যুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৩৫০ এর মতান্তরে ৪৭ এর দেশ ভাগাভাগির মত বহু বিপর্যয়কর ঘটনায় তখন চলছিল জাতীয় যুগসন্ধিক্ষণ। এই বিক্ষুব্ধ পটভূমিতে ডাঃ আহমেদের রয়েছে প্রচুর অবদান। পাকিস্তানী আমলে ও স্বাধীনোত্তর যুগে জেলার যাবতীয় দুর্দিনে ও প্রয়োজন বিভিন্ন কর্ম প্রাঙ্গনে তার ভূমিকা প্রশংসীয়। তিনি জেলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার (১৯৫৩) অন্যতম, ১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের সেক্রেটারী, জেলা পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সভাপতিসহ অনেক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। স্বীয় পেশায়  অমনোযোগী হয়েও এসব কাজ ও ঝামেলার মধ্যেও তার রোগ নির্ণয়ে সুক্ষ্মতা আশ্চর্যজনক। তার জন্ম ১৯৯৪ সালে। তিনি শহরের ষষ্টীতলা মহল্লার বাসিন্দা।

 

 

লায়লা সামাদঃ

সুসাহিত্যিক আমিনুল হকের কৃতি কন্যা লায়লা সামাদ ছিলেন দিনাজপুরের গর্ব ও গৌরব। যেকালে বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত মুসলমান নারীরা উচ্চ শিক্ষা বঞ্চিত ছিল, মুক্ত আলো-বাতাসের পরিবর্তে সাধারণ ভদ্র পরিবারে নারীরা বাধ্য ছিল গৃহপ্রাচীরের অন্তরালে জীবন কাটাতে, প্রায় অবরোধবাসিনী হয়ে-সেই কুসংস্কার শাসিত দিনেও লায়লা সামাদ হতে পেরেছিলেন উচ্চশিক্ষিতা, লেখিকা, সাংবাদিক, নৃত্যশিল্পী এবং উন্মুক্ত খেলার মাঠের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়িনী ব্যাটমিন্টন খেলোয়াড়। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নারী সাংবাদিক যিনি কলিকাতা বিশ্বদ্যিালয় থেকে সাংবাদিকতায় উচ্চ ডিগ্রী লাভ করেন (১ম স্থান অধিকার করে) অনন্যা নামে একটি মাসিক পত্রিকায় সম্পাদিকা ছিলেন এবং রচয়িতা ছিলেন অনেকগুলি মানসম্পন্ন গ্রন্থের। তিনি বরাবর দৈনিক সংবাদ এর সাংবাদিকতায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তার রচনায় ও সাংবাদিকতায় নারীমুক্তি আন্দোলনের দৃপ্ত আহবান অনুরণিত। তিনি ১৯৮৯ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

এ বি এম আব্বাসঃ

আন্তর্জাতিক পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ এ বি এম আব্বাস একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। যেকালে দিনাজপুরবাসী মুসলমান সমাজে ইঞ্জিয়ারিং পাশ করা উচ্চ শিক্ষিত ছিল সামান্যই। সেচ বিজ্ঞানে তার মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা এত বেশ ছিল যা ইতিহাসে দৃষ্টান্তবিরল । বাংলাদেশের মত ছোট তথা দরিদ্র দেশের জন্য তিনি ছিলেন যেমন গর্ব ও গৌরব-যুগপতভাবে তেমনি বিশ্বের অনেক উন্নত ও শীর্ষস্থানীয় দেশের জন্য ঈর্ষার কারণ। তার চাকুরী জীবন শুরু বৃটিশ আমলের শেষ যুগে, অতঃপর পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পর্বে তিনি সেচ বিভাগে চাকুরীরত ছিলেন। এমনকি প্রায় প্রত্যেকটি সরকারের সেচ সংক্রান্ত উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেন তিনি। এছাড়া দায়িত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার ফাকে ফাকে গভীর পড়াশোনা ও গবেষণার মন নিয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা ও কর্মক্ষেত্রে বাস্তবতা অর্জন করতে পারার ফলশ্রুতিতে তার পক্ষে সেচ বিষয়ক অনেক মূল্যবান প্রতিবেদন, নিবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করতে পারা সম্ভব হয়। তার প্রণীত ফারাক্কা বিষয়ক গ্রন্থটি আন্তর্জাতিক মানের একটি অবিস্মরণীয় অবদান। তেমনি দিনাজপুরের ইতিহাসে এক মাত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যিনি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মহাসম্মান ভূষিত। তিনি শতায়ু ছিলেন। তিনি ১৯৯৭খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

সুসাহিত্যিক আমিনুল হক (খাঁন বাহাদুর)

খ্যাতনামা উপন্যাসিক, নাট্যকার ও সরকারী উচ্চতর কর্মকর্তা আমিনুল হক ছিলেন মির্জাপুরের মির্জা বংশের অন্যতম কৃতি সন্তান। তিনি ছিলেন বহু সংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থের লেখক। বিভাগপূর্ব যুগে টাইগার হিল উপন্যাস লিখে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। চাকুরী থেকে অবসর জীবনে তিনি লেখেন অনেক গ্রন্থ। তন্মধ্যে যার ভাগ্যে যা ছিল কাফের (নাটক) প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখিকা লায়লা সামাদ তার কন্যা ছিলেন। নওরোজ সাহিত্য মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও স্থানীয় নাট্যাভিনয়-এর সঙ্গে জড়িত আমিনুল হকের দুঃসাহসিক চেষ্টায় তার রচিত সংঘর্ষ নাটকে প্রথম নারী শিল্পীর অভিনয় এর প্রবর্তন হয় দিনাজপুরের নাট্যমঞ্চে (১৯৫৪)। দিনাজপুর রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে এটা ছিল তারই প্রথম কৃতিত্ব। তিনি বিভিন্ন মহলের সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন। অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও পরিচ্ছন্ন রুচিবোধ প্রভৃতি আচরণ প্রিয়তার কারণে আমিনুল হককে বলা হতো Most unpopularly popular man in Dinajpur। তিনি ১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

 

হাসান আলীঃ

জেলাবাসী মুসলমান সমাজের প্রথম এম এ এবং প্রাথমিক মুসলমান আইনজীবিদের মধ্যেও অন্যতম বিশিষ্ট আইনজীবী; তদুপরি জেলা মুসলিম লীগ আন্দোলনের সর্বাধিক নাম পরিচিতি পান জনপ্রিয় নেতা ছিলেন হাসান আলী। তিনি দীর্ঘকাল জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। তার লীগপ্রিয়তা ছিল এমনই অকৃত্রিম যে-তার কালে জেলা মুসলিম লীগ বলতে বুঝাতো হাসান আলী কিংবা হাসান আলী বলতে বুঝাতো মুসলিম লীগ। ১৯৪৬ সালের পাকিস্তান অর্জনের লক্ষ্যে প্রাদেশিক আইন সভার গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে তার নিরুঙ্কুশ বিজয় লাভের কৃতিত্বেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমপি হওয়া ছাড়াও তিনি নবস্থাপিত পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রী পদ লাভ করেন। এক পর্যায়ে তিনি জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, দিনাজপুর হাইমাদ্রাসার সভাপতি ও মাসিক নওরোজ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তার ব্যক্তি জীবনের সর্বাধিক বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি একজন মন্ত্রী হয়েও ছিলেন কঠোর আদর্শবাদী, নীতিপরায়ন ও মনে প্রাণে ধর্মপরায়ন যার জন্য কোন প্রকারের লোভ লালসা বা অবৈধ আসকক্তি তথা সামান্যতম অন্যায় তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। শত ব্যস্ততার মধ্যেও  তিনি ছিলেন জ্ঞানসাধক এবং শেষ বয়সেও পালন করে গেছেন আইন কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব। জেলা বোর্ড নির্মিত হাসান আলী হল ত